প্রায় ১৪৫ বছর ধরে আমাদের পরিবারে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে। রূপপুরের জমিদার স্বর্গীয় শ্রী কৃষ্ণলাল চট্টোপাধ্যায় এই পূজার সূচনা করেন; আজ পরিবারের পঞ্চম প্রজন্ম সেই ধারা বহন করে চলেছে। দুর্গাপূজার দুটি ধারা — বৈষ্ণব ও শাক্ত; আমরা বৈষ্ণব মতে পূজা করি। প্রতি বছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিমা নির্মাণ
শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা রথযাত্রার পর থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়। এই দুই শুভ দিনে আমরা কাছের নদী থেকে — সম্ভব হলে পবিত্র গঙ্গা থেকে — মাটি সংগ্রহ করি, আর তার সঙ্গে মেশানো হয় গোবর, গোমূত্র, পতিতালয়ের দোরগোড়ার মাটি ও ধানের তুষ।
বাঁশ ও খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয়। তার উপর দু'প্রস্থ মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো হয়, তারপর পরানো হয় বেনারসি শাড়ি, গয়না আর ডাকের সাজ।
মহালয়া
মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনা। ভোরবেলা আকাশবাণী কলকাতার মহিষাসুরমর্দিনী শুনে বাঙালির ঘুম ভাঙে — ১৯৩১ সালে প্রথম সম্প্রচারিত সেই অনুষ্ঠান। আমরা কাছের জলাশয়ে গিয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করি। বিশ্বাস, এই সময়ে পিতৃপুরুষেরা পৃথিবীতে আসেন; তাঁদের জল ও প্রার্থনা নিবেদন করলে তাঁরা শান্তি ও মোক্ষ লাভ করেন।
এই দিন ভোরে পরিবারের সদস্যরা গঙ্গার ঘাটে যান গঙ্গাজল তুলতে — বড় তামার পাত্রে পবিত্র গঙ্গাজল ভরে, গাড়িতে বেঁধে পূজার জন্য বাড়ি নিয়ে আসা হয়।


এই দিনেই তৈরি হয় দু'রকম নারকেল নাড়ু — চিনির ও গুড়ের। পরিবারের সদস্যদের হাতে তৈরি জিনিস ছাড়া আর কিছুই দেবীকে নিবেদন করা হয় না। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও খুঁটিয়ে দেখা হয়, যাতে কিছু বাদ না পড়ে।
সংকল্প
পূজায় সংকল্প হলো এক গম্ভীর ও সচেতন ঘোষণা, যা একটি আচারের উদ্দেশ্য, পরিসর ও ফল নির্ধারণ করে। এটি উপাসকের মন, পূজার ক্রিয়া এবং আবাহিত দেবতাকে একসূত্রে বাঁধার মানসিক ও বাচিক অঙ্গীকার — যাতে পবিত্র সংকল্পই কাঙ্ক্ষিত ফলের শক্তিময় কারণ হয়ে ওঠে।
প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী
প্রতিপদে দেবী শৈলপুত্রী রূপে পূজিতা হন। আমাদের বাড়িতে এই সময় প্রতিমার পূজা হয় না; তার বদলে মাটির ঘটে নারকেল রেখে ঘটপূজা হয়। প্রতিদিন পুরোহিত চণ্ডীপাঠ করেন। পরের দিনগুলিতে একই রীতিতে ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা ও কুষ্মাণ্ডার পূজা হয়।
বোধন ও অধিবাস — ষষ্ঠী
বোধন (অকালবোধন)। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী শরৎকালে দেবতারা বিশ্রামে থাকেন, তাই এই "অকালে" দেবী দুর্গার পূজার আগে তাঁকে আচারমতে জাগ্রত করতে হয়। বেলগাছের তলায়, বা তার একটি ডালের কাছে, জলপূর্ণ তামার কলশ স্থাপন করা হয় — সেখানেই দেবীকে অধিষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
অধিবাস। মূল পূজা শুরুর আগে চারপাশ ও প্রতিমাকে শুদ্ধ করা হয় — ২৬টি মাঙ্গলিক দ্রব্য দিয়ে দেবী ও বেলগাছকে স্পর্শ করে অধিবাস সম্পন্ন হয়।
নবপত্রিকা স্নান — সপ্তমী
ভোরবেলা পুরোহিতের বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে কাছের নদী বা পুকুরে নবপত্রিকা স্নান করানো হয়। একটি কচি কলাগাছের সঙ্গে আরও আটটি পবিত্র উদ্ভিদ — কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান — হলুদ পাটের সুতোয় বাঁধা হয়। প্রতিটি উদ্ভিদ দেবী দুর্গার এক-একটি রূপের প্রতীক।

স্নানের পর নবপত্রিকাকে লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে, সিঁদুর দিয়ে গণেশের ডানদিকে কাঠের পিঁড়িতে স্থাপন করা হয়। তারপর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে প্রতিমায় প্রাণসঞ্চার করা হয়।
পুষ্পাঞ্জলি — অষ্টমী
অষ্টমী পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। সকালে উপবাস রেখে ভক্তরা সমৃদ্ধি ও মনস্কামনা পূরণের জন্য দেবীকে ফুল ও বেলপাতা নিবেদন করেন।
সন্ধিপূজা — অষ্টমী ও নবমী
অষ্টমী শেষ হয়ে নবমী শুরুর ঠিক সেই ৪৮ মিনিটে পূজার চরম মুহূর্ত। এই সময়েই দেবী দুর্গা চামুণ্ডা রূপে চণ্ড ও মুণ্ড অসুরকে বধ করেছিলেন। জ্বালানো হয় ১০৮টি মাটির প্রদীপ, নিবেদন করা হয় ১০৮টি পদ্ম ও বেলপাতা, সঙ্গে ১০৮টি বেলপাতার মালা এবং চাঁদমালা — শোলার তৈরি তিনটি গোল চাকতি, যা পবিত্রতা, সৌন্দর্য, শান্তি ও প্রশান্তির প্রতীক। আমাদের বাড়িতে এই সময় বিশেষ ভোগ হিসেবে দুধের ছানা নিবেদন করা হয়।

কুমারী পূজা, হোম ও ধুনুচি নাচ — নবমী
মহাস্নান ও ষোড়শোপচার পূজার পর হয় কুমারী পূজা। পাঁচ থেকে এগারো বছরের একটি মেয়েকে দেবীরূপে পূজা করা হয় — দুধে তার পা ধুইয়ে আলতা পরানো হয়, দেওয়া হয় নতুন জামা ও উপহার। তারপর নবমী হোম (বৈদিক যজ্ঞ) হয়।
পূজা শেষের পথে, তাই নবমীর রাত স্মরণীয় হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর ঢাকের তালে ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচে।
বিজয়া দশমী
দশমী আবেগঘন বিদায়ের দিন — মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় এবং তাঁর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার দিন।
- দর্পণ বিসর্জন। সকালে পুরোহিত একটি বড় জলের পাত্রে আয়না রাখেন। আরও দুটি পাত্র প্রস্তুত হয় — একটিতে হলুদ মেশানো জল, অন্যটিতে দুধ ও আলতা। ভক্তরা তিনটি পাত্রে দেবীর প্রতিবিম্ব দেখেন — প্রতিমা থেকে দেবীর বিদায়ের প্রতীক।
- দেবীবরণ। লালপাড় সাদা শাড়ি পরে বিবাহিতা মহিলারা মিষ্টি, পান ও সিঁদুর দিয়ে মাকে বরণ করে বিদায় জানান, তারপর একে অপরকে সিঁদুর মাখান।
- বিসর্জন। ঢাকের তালে শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় কাছের নদী বা পুকুরে বিসর্জনের জন্য।
- বিজয়ার শুভেচ্ছা। বিসর্জনের পর সবাই শুভ বিজয়া জানান। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, আর সবাই মিলে নাড়ু-নিমকির মতো মিষ্টিমুখ করেন।
আমাদের বাড়ির নিজস্ব রীতি
- ভোগ। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ভোগ নিবেদন হয় — প্রতিদিন আলাদা ডাল: সপ্তমীতে মুগ, অষ্টমীতে ছোলা, নবমীতে অড়হর। সঙ্গে থাকে খিচুড়ি, ভাজা, তরকারি আর ছোট ছোট কলার বড়া ভেজানো পায়েস। থাকে বিশেষ পদ মোচার ঘণ্ট — কলার থোড় ও মোচা দিয়ে তৈরি। রাতে লুচি ও নারকেল নাড়ু নিবেদন করা হয়।
- অপরাজিতার বালা। দশমীর সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর পরিবারের সব পুরুষ সদস্য অপরাজিতা লতা বাহুতে বাঁধেন; শিশুদের কবজিতেও তা বাঁধা হয় দীর্ঘায়ু ও সুরক্ষার জন্য। দেবী অপরাজিতা দেবী দুর্গারই এক উগ্র রূপ হিসেবে পূজিতা।
- "শ্রীশ্রী দুর্গা মাতা সহায়"। বিসর্জনের পর বেলকাঠি দিয়ে আলতায় কলাপাতার উপর এই কথাটি লিখে সশ্রদ্ধায় দেবীর বেদিতে রাখা হয়।
- নিরামিষ পূজা। বৈষ্ণব রীতি মেনে পূজার দশ দিন পরিবারে কঠোরভাবে নিরামিষ আহার চলে; একাদশ দিনে মাছ বা মাংস খেয়ে তা ভাঙা হয়।