जटाजूट समयुक्ताम अर्धेन्दु कृतेशेखाराम ।
लोचनत्रय संयुक्तां पूर्णेंदु सदृशानानाम् ॥
अतसी पुष्प वर्नाभां सुप्रतिष्ठां सुलोचानां ।
नवयौवन संपन्न सर्वाभरण भूषितम् ॥
सुचारु दशानां तद्वत पीनोंन्नत पयोधराम ।
त्रिभंगस्थान सम्स्तानं महिषासुरमर्दिनीम् ॥— মার্কণ্ডেয় পুরাণ
দুর্গাপূজা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় উৎসব। শরৎকালে দশ দিনের জন্য দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে হিমালয়ে তাঁর পিত্রালয়ে ফেরেন। এ যেন বিশ্বের সব প্রান্তের বাঙালির কাছেও ঘরে ফেরার ডাক।
আমাদের বাড়িতে গত ১৪৫ বছর ধরে দেবী দুর্গার পূজা হয়ে আসছে। আমার প্রপিতামহ স্বর্গীয় শ্রী কৃষ্ণলাল চট্টোপাধ্যায়, তখনকার দিনের জমিদার, এই পূজা শুরু করেন; আজ আমরা পঞ্চম প্রজন্ম সেই পূজা চালিয়ে যাচ্ছি। দুর্গাপূজার দুটি ধারা — বৈষ্ণব ও শাক্ত; আমরা বৈষ্ণব মতে পূজা করি। প্রতি বছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজা হয়।

প্রতিমা নির্মাণ
শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী বা রথযাত্রার পর থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়। এই দুই শুভ দিনে আমরা কাছের নদী থেকে — সম্ভব হলে পবিত্র গঙ্গা থেকে — মাটি সংগ্রহ করি, আর তার সঙ্গে মেশাই গোবর, গোমূত্র, পতিতালয়ের দোরগোড়ার মাটি ও ধানের তুষ।
বাঁশ ও খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয়। তার উপর দু'প্রস্থ মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো হয়, তারপর পরানো হয় বেনারসি শাড়ি, গয়না আর ডাকের সাজ।
মহালয়া
এই দিনে দুর্গাপূজার — দেবীপক্ষের — সূচনা। ভোরবেলা বাঙালির ঘুম ভাঙে আকাশবাণী কলকাতার বিশেষ অনুষ্ঠান মহিষাসুরমর্দিনী শুনে, যা প্রথম সম্প্রচারিত হয়েছিল ১৯৩১ সালে। এই দিনে আমরা কাছের জলাশয়ে গিয়ে পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা জানাতে তর্পণ করি। বিশ্বাস, এই সময়ে পিতৃপুরুষদের আত্মা পৃথিবীতে আসেন; তাঁদের জল ও প্রার্থনা নিবেদন করলে তাঁরা শান্তি পান এবং মোক্ষ লাভ করেন।
এই দিনেই পূজার জন্য বড় তামার পাত্রে গঙ্গাজল আনা হয়। পূজার নৈবেদ্যের জন্য তৈরি হয় বিশেষ মিষ্টি নারকেল নাড়ু — চিনির ও গুড়ের, দু'রকম। পরিবারের সদস্যদের হাতে তৈরি জিনিস ছাড়া আর কিছুই দেবীকে নিবেদন করা যায় না। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে কিছু বাদ পড়ল কি না, তাও খুঁটিয়ে দেখা হয়।



প্রথম দিন: প্রতিপদ
দেবী শৈলপুত্রী রূপে পূজিতা হন। আমাদের বাড়িতে এই সময় প্রতিমার পূজা হয় না; শুধু মাটির ঘটে নারকেল রেখে তার পূজা হয়। প্রতিদিন পুরোহিত চণ্ডীপাঠ করেন।
দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিন
এই দিনগুলিতে যথাক্রমে দেবী ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা ও কুষ্মাণ্ডার পূজা হয়। আচার প্রায় প্রথম দিনের মতোই।
ষষ্ঠ দিন: ষষ্ঠী
সন্ধ্যায় বোধন (জাগরণ) ও অধিবাস (আবাহন ও শুদ্ধিকরণ) দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্গাপূজার সূচনা হয়। কোনো কোনো বাড়িতে বলিও হয়।
বোধন। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী শরৎকালে দেবতারা বিশ্রামে থাকেন। এই অসময়ে দেবী দুর্গার পূজা করতে হলে আগে আচারমতে তাঁকে গভীর নিদ্রা থেকে জাগাতে হয়। একে বলে অকালবোধন। বেলগাছের তলায়, বা তার একটি ডালের কাছে, জলপূর্ণ তামার ঘট (কলশ) স্থাপন করা হয় — সেখানেই দেবীর আত্মাকে অধিষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
অধিবাস। মূল পূজা শুরুর আগে চারপাশ ও প্রতিমাকে শুদ্ধ করার জন্য অধিবাস। ২৬টি মাঙ্গলিক দ্রব্য দিয়ে দেবী ও বেলগাছকে স্পর্শ করে শুদ্ধিকরণ সম্পন্ন হয়।
সপ্তম দিন: সপ্তমী
প্রধান আকর্ষণ ভোরের নবপত্রিকা স্নান — একসঙ্গে বাঁধা নয়টি উদ্ভিদ, যা স্বয়ং দেবীর প্রতীক, পুরোহিতদের বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে কাছের নদী বা পুকুরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান করানো হয়।

একটি কচি কলাগাছের সঙ্গে আরও আটটি পবিত্র উদ্ভিদ — কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান — হলুদ পাটের সুতোয় বাঁধা হয়। প্রতিটি উদ্ভিদ দেবী দুর্গার এক-একটি বিশেষ রূপের প্রতীক। স্নানের পর নবপত্রিকাকে লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে, সিঁদুর মাখিয়ে, গণেশের ডানদিকে কাঠের পিঁড়িতে স্থাপন করা হয়। এরপর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে মূল দুর্গাপ্রতিমায় প্রাণসঞ্চার করা হয়।


অষ্টম দিন: অষ্টমী
দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শুভ দিন।
পুষ্পাঞ্জলি। সবচেয়ে জনপ্রিয় আচার — সকালে উপবাস রেখে ভক্তরা সমৃদ্ধি ও মনস্কামনা পূরণের জন্য দেবীকে ফুল ও বেলপাতা নিবেদন করেন।
সন্ধিপূজা। দিনের চরম মুহূর্ত — অষ্টমী শেষ হয়ে নবমী শুরুর ঠিক সেই ৪৮ মিনিটে। এই মুহূর্তেই দেবী দুর্গা চামুণ্ডা রূপে চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন। জ্বালানো হয় ১০৮টি মাটির প্রদীপ, নিবেদন করা হয় ১০৮টি পদ্ম ও বেলপাতা। কোনো কোনো বাড়িতে এই সময় বলি হয়; কোথাও নিবেদন করা হয় ১০৮টি বেলপাতার মালা ও চাঁদমালা — শোলার তৈরি তিনটি গোল চাকতি, যা পবিত্রতা, সৌন্দর্য, শান্তি ও প্রশান্তির প্রতীক। আমাদের বাড়িতে এই সময় বিশেষ ভোগ হিসেবে দুধের ছানা নিবেদন করা হয়।


নবম দিন: নবমী
নিয়মমাফিক মহাস্নান ও ষোড়শোপচার পূজার পর হয় কন্যাপূজা বা কুমারী পূজা। পাঁচ থেকে এগারো বছরের একটি মেয়েকে পূজা করা হয় — দুধে তার পা ধুইয়ে আলতা পরানো হয়, দেওয়া হয় নতুন জামা, উপহার ও নানা সামগ্রী। কুমারী পূজার পর হয় নবমী হোম বা বৈদিক যজ্ঞ। কোনো কোনো বাড়িতে এই সময় বলি হয়।
দুর্গাপূজা প্রায় শেষের পথে, তাই এই রাতকে মানুষ স্মরণীয় করে তোলেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর ঢাকের তালে ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচে।
দশম দিন: বিজয়া দশমী
দুর্গাপূজার আবেগঘন সমাপ্তি — মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয় এবং তাঁর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার প্রতীক।
দর্পণ বিসর্জন। সকালে পুরোহিত একটি বড় জলের পাত্রে আয়না রাখেন। আরও দুটি পাত্র প্রস্তুত হয় — একটিতে হলুদ মেশানো জল, অন্যটিতে দুধ ও আলতা মেশানো জল। ভক্তরা তিনটি পাত্রে দেবীপ্রতিমার প্রতিবিম্ব দেখেন — প্রতিমা থেকে দেবীর দিব্য আত্মার বিদায়ের প্রতীক।
দেবীবরণ। লালপাড় সাদা শাড়ি পরে বিবাহিতা মহিলারা মিষ্টি, পান ও সিঁদুর দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মাকে বিদায় জানান। বরণের পর তাঁরা একে অপরকে সিঁদুর মাখান।

বিসর্জন। ঢাকের ছন্দে বিশাল শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় কাছের নদী বা পুকুরে বিসর্জনের জন্য।
বিজয়ার শুভেচ্ছা। বিসর্জনের পর সবাই একে অপরকে শুভ বিজয়া জানান। ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেয়, আর সবাই মিলে নাড়ু-নিমকির মতো প্রথাগত মিষ্টি ভাগ করে খান।
আমাদের বাড়ির বিশেষ রীতি
ভোগ। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ভোগ নিবেদন হয়। এই তিন দিনে তিন রকম ডাল — সপ্তমীতে মুগ, অষ্টমীতে ছোলা, নবমীতে অড়হর। সঙ্গে থাকে খিচুড়ি, ভাজা, তরকারি আর পায়েস — যার মিষ্টি রসে ভেজানো থাকে ছোট ছোট কলার বড়া। কলার থোড় ও মোচা দিয়ে তৈরি বিশেষ পদ মোচার ঘণ্ট-ও নিবেদন করা হয়। রাতে ভোগে দেওয়া হয় লুচি ও নারকেল নাড়ু।
অপরাজিতা। দশমীর সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর পরিবারের সব পুরুষ সদস্য একত্র হয়ে বাহুতে অপরাজিতা লতার বালা পরেন। শিশুদের কবজিতেও এই লতা বাঁধা হয় দীর্ঘায়ু ও অশুভ শক্তি থেকে সুরক্ষার জন্য — এক রক্ষাকবচের মতো, কারণ দেবী অপরাজিতা দেবী দুর্গারই এক উগ্র, অশুভনাশিনী রূপ হিসেবে পূজিতা।
দশমী। এই দিনে প্রতিমা বিসর্জনের পর আমরা বেলকাঠি দিয়ে আলতার কালিতে কলাপাতায় লিখি "শ্রীশ্রী দুর্গা মাতা সহায়", তারপর সশ্রদ্ধায় তা দেবী দুর্গার বেদিতে রাখি।
একাদশ দিন
আগেই বলেছি, আমরা বাড়িতে বৈষ্ণব মতে দেবী দুর্গার পূজা করি, এবং এই দশ দিন কঠোরভাবে আমিষ খাবার এড়িয়ে চলি। একাদশ দিনে মাছ বা মাংস খেয়ে সেই নিয়ম ভাঙা হয়।
দুর্গাপূজা যখন তার উজ্জ্বল সমাপ্তির দিকে এগোয়, আমরা শুধু দশ দিনের একনিষ্ঠ ভক্তিই উদযাপন করি না — উদযাপন করি অশুভের বিরুদ্ধে শুভের চিরন্তন জয়। বাংলায় এই পূজা নিছক আচার-অনুষ্ঠানের অনেক ঊর্ধ্বে; এ বাঙালিকে বেঁধে রাখে একটিই স্পন্দিত হৃদয়ে — আমেরিকা, ব্রিটেনের মতো দূর দেশ থেকেও প্রবাসীদের ঘরে টেনে আনে, আর ফেরা সম্ভব না হলে বিদেশের মাটিতেই গড়ে ওঠে আনন্দমুখর প্যান্ডেল। এই বিরাট উৎসব বাংলার অর্থনীতিকে সচল রাখে, আর বাংলার আত্মাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেয় — ২০২১ সালে ইউনেস্কোর মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যা পেয়েছে তার যোগ্য স্থান। মা দুর্গার কৃপায় আমরা পাই অটুট ঐক্য, অদম্য শক্তি, আর তাঁর ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
