দুর্গাপূজা ২০২৬: মহাষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর · সন্ধিপূজা ১৯ অক্টোবর সকাল ৭:২৬–৮:১৪।

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · ঐতিহ্য, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজা ও তার তাৎপর্য

গুপ্তিপাড়ার প্রথম বারোয়ারি পুজো থেকে কলকাতার থিম প্যান্ডেল — দুর্গাপূজা কীভাবে বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব হয়ে উঠল, কেন সারা পৃথিবী থেকে মানুষ তা দেখতে আসেন, একচালা আর বারোয়ারি প্রতিমার তফাত কোথায়, আর হাওড়ায় আমাদের মতো পারিবারিক পুজোর জায়গা কোথায়।

কলকাতার চেতলা অগ্রণী ক্লাবের সাজানো থিম প্যান্ডেলের সামনে ভিড়
ছবি: Biswarup Ganguly, CC BY 3.0, উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে (আকার ছোট করা)

প্রতি শরতে পাঁচটা দিন পশ্চিমবঙ্গ শুধু মা দুর্গার। অফিস বন্ধ, মাঝরাতেও শহর জেগে, আর বহু বছর আগে ঘর ছেড়ে যাওয়া মানুষও ফিরে আসেন বাড়িতে। দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসব ঠিকই, কিন্তু বাংলায় তা একসঙ্গে ঘরে ফেরা, শিল্পের প্রদর্শনী, পথের মেলা — আর বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

সবার উৎসব হয়ে ওঠা

বহু শতাব্দী ধরে পুজো হতো জমিদার আর ধনী পরিবারের উঠোনে — বনেদি বাড়িতে। বদলের শুরু ১৭৯০ সালে, হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। কথিত আছে, এক জমিদারবাড়ির পুজো থেকে ফিরিয়ে দেওয়া বারোজন যুবক পাড়া থেকে চাঁদা তুলে নিজেরাই পুজো করলেন। ‘বারো’ আর ‘ইয়ার’ মিলে এল বারোয়ারি শব্দ।

ভাবনাটা নদীর ধার ধরে ছড়াল, তারপর পৌঁছল কলকাতায় — যেখানে সর্বজনীন পুজোই হয়ে উঠল উৎসবের প্রাণ। আজ রাজ্য জুড়ে হাজার হাজার পাড়ার কমিটি পুজো করে, পাশাপাশি চলছে কখনো না থামা পারিবারিক পুজোগুলিও।

কলকাতার পুজো: যে শহর ঘুমোয় না

পুজোর কলকাতা প্রথমবার দেখলে চমকে যেতেই হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী, গোটা শহরটাই যেন এক বিরাট খোলা আকাশের শিল্প-প্রদর্শনী।

থিম পুজো এই শহরের পরিচয়। শিল্পী আর নকশাকাররা মাসের পর মাস খাটেন একটি প্যান্ডেলের পেছনে — মাটির ভাঁড়ে গড়া মন্দির, আলোর প্রাসাদ, পাট বা বাঁশে তৈরি গোটা একটা গ্রাম, কিংবা সমাজের কোনো ভাবনা, যা রূপ নেয় স্থাপত্যে। পুরস্কারের প্রতিযোগিতা চলে, আর সবচেয়ে আলোচিত প্যান্ডেলের লাইন গিয়ে ঠেকে রাস্তার অনেক দূরে।

পুজোর সময় শ্রীভূমি মেন রোডে ভিড়
উত্তর কলকাতার শ্রীভূমি মেন রোডে ঠাকুর দেখার ভিড়। ছবি: Biswarup Ganguly, CC BY 3.0, উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে (আকার ছোট করা)

আর আছে শহরের সেই চেনা আমেজ:

  • রাত জেগে ঠাকুর দেখা — বন্ধু আর পরিবারের সঙ্গে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় হাঁটা।
  • মোড়ে মোড়ে খাবার — ফুচকা, এগরোল, তেলেভাজা, আর অবশ্যই মিষ্টি।
  • পুজোর প্রতিটি দিনের জন্য নতুন জামা, কয়েক সপ্তাহের পুজোর বাজারের পর।
  • বাড়িগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঢাকের আওয়াজ, সন্ধ্যারতির ধুনোর গন্ধ, আর শেষ না হওয়া আড্ডা।
  • চারদিকে আলো — যার অনেকটাই হুগলির চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের হাতের কাজ।

এই সবকিছুর পেছনে রয়েছেন হাজার হাজার কারিগর। উত্তর কলকাতার পুরনো কুমোরপাড়া কুমোরটুলিতে প্রতিমাশিল্পীরা মাসের পর মাস কাজ করেন, আর তাঁদের গড়া প্রতিমা পাড়ি দেয় দেশের নানা প্রান্তে, এমনকি বিদেশেও।

একচালা আর বারোয়ারি প্রতিমা: তফাত কোথায়?

একটি পারিবারিক পুজো আর একটি বড় সর্বজনীন পুজোয় পরপর দাঁড়ালেই চোখে পড়বে, মা নিজেও দুই জায়গায় দুই রূপে।

একচালা প্রতিমা। ‘এক’ মানে একটি, ‘চালা’ মানে কাঠামো। মা দুর্গা, মহিষাসুর, সিংহ, আর তাঁর সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ — সবাই দাঁড়িয়ে একটিই খিলানওয়ালা কাঠামোর নিচে, পেছনে আঁকা চালচিত্র। যেন গোটা পরিবার একসঙ্গে বাপের বাড়ি ফিরছে। প্রতিমার মাপ পারিবারিক ঠাকুরদালানের মতো, মুখের গড়ন চিরাচরিত বাংলা ধাঁচের, টানা টানা বড় চোখ, আর সাজ সাধারণত ডাকের সাজ বা শোলার। এটিই সাবেকি রূপ — রূপপুর চ্যাটার্জি বাড়িতে আমরা এই রূপই ধরে রেখেছি।

বারোয়ারি প্রতিমা। সর্বজনীন পুজোয় স্বাধীনতা অনেক বেশি। মূর্তিগুলি প্রায়ই আলাদা আলাদা গড়া হয়, প্রত্যেকের নিজস্ব জায়গা, আর সাধারণত আকারে বড় ও বেশি জীবন্ত, যাতে দূর থেকেও ভিড় দেখতে পায়। থিম পুজোয় প্রতিমাকে একেবারে নতুন করে ভাবা হয় — প্যান্ডেলের ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে উপকরণ, রং আর গড়ন।

রূপপুর চ্যাটার্জি বাড়ির একচালা প্রতিমাকলকাতার ডোভার লেনে সিংহী পার্কের বারোয়ারি প্রতিমা
বাঁদিকে: রূপপুরে আমাদের একচালা প্রতিমা, গোটা পরিবার একই কাঠামোয়। ডানদিকে: কলকাতার সিংহী পার্কের বারোয়ারি প্রতিমা, প্রতিটি মূর্তি আলাদা গড়া। ডানদিকের ছবি: Pramanikshreya, CC BY-SA 4.0, উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে (আকার ছোট করা)

কোনোটিই অন্যটির চেয়ে কম ভক্তির নয়। একটিতে বাঁধা থাকে একটি পরিবারের স্মৃতি, অন্যটিতে গোটা পাড়ার কল্পনা।

যে উৎসব দেখতে আসে গোটা পৃথিবী

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় যুক্ত করে। এই স্বীকৃতির পর বিদেশে নতুন করে আগ্রহ জেগেছে, আর প্রতি বছর আরও বেশি বিদেশি পর্যটক পুজোকে ঘিরেই সফরের পরিকল্পনা করেন। ট্যুর সংস্থাগুলি ঠাকুর দেখার গাইডেড সফর, পুরনো পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্য-সফর, আর কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়া দেখার ব্যবস্থা করে।

কলকাতার বড়িশায় উদ্ভিজ্জ উপকরণে গড়া থিম প্রতিমা
কলকাতার বড়িশার থিম পুজো, যেখানে প্রতিমা আর প্যান্ডেল একই ভাবনায় গাঁথা। ছবি: Ramakrishna Reddy Y, CC BY 2.0, উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে (আকার ছোট করা)

২০১৬ সাল থেকে দশমীর পর রেড রোডে রাজ্য সরকার আয়োজন করে দুর্গাপূজা কার্নিভাল — বাছাই করা পুজোগুলি ঢাকি আর লোকশিল্পীদের সঙ্গে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা করে, দর্শকদের মধ্যে থাকেন বহু বিদেশি অতিথিও।

বাংলার অর্থনীতিতেও পুজোর গুরুত্ব বিরাট। রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০১৯ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, এই উৎসব ঘিরে সৃজনশীল অর্থনীতির মূল্য প্রায় ৩২,৩৭৭ কোটি টাকা — রাজ্যের জিডিপির প্রায় ২.৬ শতাংশ। সেই টাকা পৌঁছয় প্রতিমাশিল্পী, প্যান্ডেল-কারিগর, আলোকশিল্পী, ঢাকি, দর্জি, মিষ্টির দোকান, হোটেল আর ফেরিওয়ালাদের কাছে। অনেকের কাছে পুজোর মরসুমই সারা বছরের ভরসা।

কলকাতার বাইরে: হুগলি ও হাওড়া

নদী পেরোলেই চোখে পড়ে পুজোর আরও শান্ত, আরও পুরনো এক রূপ। হুগলি বাংলাকে দিয়েছে বারোয়ারি পুজো, আর চন্দননগরের মতো শহর আলোয় ভরিয়ে দেয় গোটা অঞ্চল। হাওড়া বললে অনেকে সেতুর শহরটাই বোঝেন, কিন্তু জেলার অনেকটাই গ্রাম, আর সেখানকার পুরনো পরিবারগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুজো চালিয়ে যাচ্ছে — একচালা প্রতিমা, পঞ্জিকা মেনে আচার, আর বাড়িতে তৈরি ভোগ নিয়ে।

এই গল্পে আমাদের জায়গা

হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের রূপপুর চ্যাটার্জি বাড়িতে পুজো শুরু ১৪৫ বছর আগে, ১৮৮১ সালে — রূপপুরের জমিদার স্বর্গীয় শ্রী কৃষ্ণলাল চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। আজ পরিবারের পঞ্চম প্রজন্ম বৈষ্ণব মতে সেই পুজো এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

পুজোয় কলকাতায় থাকলে বড় বড় থিম প্যান্ডেল দেখুন, তারপর একটা দিন রাখুন গ্রামের জন্য। সেখানকার পারিবারিক পুজো ছোট, শান্ত, আর বাংলার ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় যেভাবে পুজো হতো, তার অনেক কাছাকাছি। আমাদের দুর্গামন্দিরে আসার পথনির্দেশ রয়েছে দর্শন পাতায়

আরও পড়ুন

· আচার

দুর্গাপূজা: ছবি ও কথায়

রূপপুরে আমাদের বাড়ির দুর্গাপূজার প্রত্যক্ষ বিবরণ — প্রতিমা নির্মাণ ও মহালয়া থেকে সন্ধিপূজা, কুমারী পূজা, দর্পণ বিসর্জন, আর চট্টোপাধ্যায় পরিবারের নিজস্ব রীতি।

লিখেছেন সাত্যকি চ্যাটার্জি

· পঞ্জিকা

এ বছর মহাসপ্তমী দু'দিন কেন

এ বছর পঞ্জিকায় মহাসপ্তমী দু'দিন — ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ২০২৬। তিথি কীভাবে গোনা হয়, একটি তিথি কেন দুটি সূর্যোদয় ছুঁয়ে যায়, আর দ্বিতীয় দিনের সপ্তমীর অধিক পূজা মানে কী — সহজ করে।

লিখেছেন রূপপুর চ্যাটার্জি বাড়ি পরিবার

খুঁজে দেখুন: “সন্ধিপূজা”, “ভোগ” বা “২০২৬”